বাজেট
বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট করতে চায় সরকার

জাতীয় বাজেট
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আঁটসাঁট বাজেট দিতে যাচ্ছে ড. মুহাম্মাদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থনীতির বিদ্যমান বাস্তবতায় আগামী বাজেট অত বড় করার ইচ্ছা নেই সরকারের। কারণ, রাজস্ব আহরণের অবস্থা ভালো নয়। অথচ ব্যয়ের চাপ ঠিকই আছে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে চলতি অর্থবছরে নিত্যপণ্য আমদানিতে অনেক শুল্ক ছাড় দিতে হয়েছে সরকারকে। এ ঘাটতি পূরণে নতুন করে শতাধিক পণ্যে আবার মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করেছে। এ জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের ক্ষেত্রে লাগাম টানবে সরকার। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর ঢাউস আকারের বাজেট দেওয়া হলেও তা বছর শেষে বাস্তবায়িত হয় না। এ জন্য আগামী অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এবারই প্রথম করজাল সম্প্রসারণের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য আয়কর দাতাদের চিহ্নিত করা হবে। বাজেটে আয়কর খাত থেকে বেশি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করা হবে।
সূত্র জানায়, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে পাঁচ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করার প্রাথমিক টার্গেট দেওয়ার চিন্তা ছিল। কিন্তু এখন তা কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ের এই টার্গেট কোনোভাবেই পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ আগামী অর্থবছরের শেষ ভাগে একটি সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয়। আর আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের বাড়ানোর জন্য যে ব্যাপক করজাল সম্প্রসারণ করা দরকার, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তাও করা সম্ভব হবে না। এসব কারণে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট পাঁচ লাখ কোটি টাকার নিচে রাখাই সমীচীন হবে। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, আসছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং খাদ্য, আবাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন করে সমতাভিত্তিক দেশ গঠন। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে বিভিন্ন রকম সংস্কার কার্যক্রম, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান-বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
জানা গেছে, সরকার বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দিতে অংশীজনদের সঙ্গে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসব্যাপী সিরিজ বৈঠক শুরু করতে যাচ্ছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে এই বৈঠকগুলো হওয়ার কথা রয়েছে।
আসন্ন বাজেট ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) সংশোধনের ক্ষেত্রে এবার বৈদেশিক অর্থায়নের পরিমাণ দেশীয় অর্থায়নের তুলনায় বেশি থাকবে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ হবে। রাজস্ব আয় না বাড়ার কারণে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, আগামী বাজেটের দৃশ্যমান আলোচনা আগেভাগে শুরু হবে। এতদিন অভ্যন্তরীণ কাজ হয়েছে। এবার বাজেটের কাজ আগেভাগেই শেষ করা যাবে।
এদিকে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আয়কর-সম্পর্কিত বিভিন্ন আইন ও বিধি সংশোধন, সংযোজন বা পরিবর্তনের জন্য দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রস্তাব ও সুপারিশ আহ্বান করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের কাছে গত সোমবার চিঠি পাঠিয়ে তাদের প্রস্তাব ও সুপারিশ চেয়েছে এনবিআর। সংস্থাটি জানায়, রাজস্ব আহরণের অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে আয়করসহ অন্যান্য প্রত্যক্ষ কর জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রত্যক্ষ করব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী ও অংশীদারত্বমূলক করার লক্ষ্যে ২০২৫-২৬
অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের প্রচেষ্টাকে এনবিআর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে আয়করসহ অন্যান্য প্রত্যক্ষ করসংক্রান্ত আইন ও বিধির ওপর সুচিন্তিত মতামত, প্রস্তাব ও সুপারিশ আহ্বান করা হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি, চেম্বার ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো চিঠিতে মোট চারটি বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মতামত চেয়েছে এনবিআর। বিষয়গুলো হচ্ছেÑ ২০২৩ সালের আয়কর আইন; ২০২৪ সালের উৎসে কর বিধিমালা ও অন্যান্য বিধিমালা; ২০০৩ সালের ভ্রমণ কর আইন এবং ১৯৯০ সালের দান কর আইন।
এসব বিষয়ে প্রস্তাব ও সুপারিশ করার জন্য চিঠিতে ছক তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এনবিআরের করনীতি শাখার কাছে (হার্ড কপি) সুপারিশ ও প্রস্তাব পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমেও প্রস্তাব সুপারিশ পাঠানো যাবে।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময় এসে শুল্ক-করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণের জন্য। এর মাধ্যমে শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতি কমাতে ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এই প্রথম নিয়ন্ত্রণমূলক বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য পাবলিক সেক্টরে ব্যয়ের লাগামও টানা হচ্ছে। সেই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়ের লাগামও আপাতত টেনে ধরার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। এতে করে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ কমে আসবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে আইএমএফ ও অর্থবিভাগ। এমনিতেই দেশের অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। এমন শ্লথগতি আরও অন্তত দুই বছর চলমান থাকবে। এর ফলে চলতি বছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে। তবে দুই বছর পর এই প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে শুরু করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
এই পরিস্থিতিতে আপাতত নিয়ন্ত্রণমূলক বাজেট দিয়ে অর্থনীতির অচলাবস্থার উন্নতি ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে যে কোনো মূল্যে বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে না পারলে মূল্যস্ফীতির লাগাম কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না বলে মনে করে আইএমএফ। এ জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন