আজ মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও তাৎপর্যময় রজনী ‘শবে বরাত’। শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে ‘শবে বরাত’ বলা হয়। শবে বরাত কথাটি ফারসি থেকে এসেছে। ‘শব’ মানে রাত, ‘বরাত’ মানে মুক্তি। শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত। শবে বরাতের আরবি হলো ‘লাইলাতুল বারাআত’। হাদিস শরিফে যাকে ‘নিসফ শাবান’ বা ‘শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী’ বলা হয়েছে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, নিশ্চয় আল্লাহ এরাতে সূর্য ডোবার সাথে সাথে পৃথিবীর আসমানে আগমন করেন আর বলেন- ‘কোনো গুনাহগার কি আছে যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো। কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী কি আছে যে আমার কাছে রিজিক চাইবে? আমি তাকে রিজিক দিবো। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি যে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে চায়? আমি তাকে মুক্তি দিব। ফজর পর্যন্ত এরূপ বলতে থাকেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ হাদিস নংঃ ১৩৮৮)
সূরা দুখানের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। সে রাতে সব গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা নির্ধারিত হয়।’ সুনানে ইবনে মাজাহ শরিফে হযরত আলি রা. বর্ণিত এক হাদিসে রয়েছে নবিজি বলেছেন, যখন শাবান মাসের অর্ধেক রজনী আসে তখন তোমরা রাতে নামাজ পড়ো ও দিনের বেলা রোজা রাখো।
শবে বরাতকে অনেক আলেম ভাগ্য নির্ধারণের রজনী বলে থাকেন। তাঁদের মতে- শবে বরাতের পবিত্র রজনীতে আল্লাহ তায়ালা সপ্তম আসমান থেকে নেমে পৃথিবীর নিকটে আসে এবং মানুষের জীবন-মৃত্যু, রিজিক, কল্যাণ ও বিপদ সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নির্ধারণ করা হয়। তবে আকিদার দৃষ্টিকোণ থেকে আলেমরা স্পষ্ট করেন আল্লাহর ইলম চিরন্তন, শবে বরাত নতুন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাত নয়, বরং বান্দার সামনে তাকদির প্রকাশ ও কার্যকর করার এক ধাপমাত্র।
হাদিস শরিফে আরো উল্লেখিত আছে, হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত- ‘নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধশাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, রাজিন: ২০৪৮, মুসনাদে আহমদ-চতুর্থ খণ্ড-পৃষ্ঠা: ১৭৬)।
হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবীজি (সা.) এ রাতে মদিনার কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে এসে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন। তিনি আরও বলেন, নবীজি (সা.) তাঁকে বলেছেন, এ রাতে বনি কালবের ভেড়া–বকরির পশমের (সংখ্যার পরিমাণের) চেয়েও বেশিসংখ্যক গুনাহগারকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি: ৭৩৯) ।
ইবনে উমর রা. বলেন, পাঁচটি রাত এমন রয়েছে যে রাতগুলোতে বান্দা দোয়া করলে সে দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয়না। ১.জুম্মার রাতের দোয়া ২.রজব মাসের প্রথম রাতের দোয়া ৩. শাবান মাসের পনেরো তারিখের রাত্রি তথা শবে বরাতের দোয়া। ৪ ও ৫. দুই ঈদের রাতের দোয়া। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক হাদিস ৮১৭৫)
উল্লিখিত হাদিসসমূহের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে শবে বরাতের ফজিলত অব্যাহত রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি এটাকে জানার পরও অস্বীকার করবে সে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিসকে অস্বীকার কারী বলে সাব্যস্ত হবেন।
এদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন শবে বরাতে আতশবাজি, অনাকাঙ্ক্ষিত আলোকসজ্জা ও অপচয় পরিহার করে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা কবর জিয়ারতের ক্ষেত্রে শালীনতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখারও অনুরোধ করেছে।
ধর্মীয় আলোচকরা বলেন, শবে বরাত কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয় এ রাত আত্মসমালোচনা, তওবা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে মানবকল্যাণে নিজেকে প্রস্তুত করার শিক্ষাই শবে বরাতের মূল বার্তা।
শবে বরাত আমাদের শেখায় ক্ষমা চাইতে, ক্ষমা করতে এবং নতুনভাবে শুরু করতে। অতিরঞ্জন ও অবহেলা এই দুই প্রান্ত এড়িয়ে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ইবাদত করাই এ রাতের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করে।