আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের এলাকাভিত্তিক লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও। রাজনৈতিক নেতাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তারা গোপনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে ‘দিলীপ ওরফে বিনাশ’ নামে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম প্রকাশ করেছেন গোয়েন্দারা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুগত বাহিনীর অপতৎপরতা বেড়েছে। ৫ আগস্টের পর কারাবন্দি অনেক সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে এসে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে দলবদল শুরু করে। তারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানে চাঁদার হার নির্ধারণ করে দেওয়ায় এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে পলাতক সন্ত্রাসীরা দলীয় পরিচয় গ্রহণের চেষ্টা করছে। অনেকে রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে থাকার তদবির করছে। পুরনো সন্ত্রাসীদের অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টার মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এতে তৎপরতা কিছুটা কমলেও নির্বাচন সামনে রেখে তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম ততই বাড়ানো হচ্ছে। দেশ-বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীরা যাতে কোনোভাবেই নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আমরা নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছি। একটি সুশৃঙ্খল নির্বাচন আয়োজনের জন্য সন্ত্রাসীদের কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ভূমিকা শনাক্ত করা হয়েছে এবং বাইরে থাকা সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা দেখছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জামিনে মুক্তি পাওয়া সন্ত্রাসীদের অনেকে বিদেশে পালিয়েছে, কেউ দেশে আত্মগোপন করে আছে। তারা যেকোনো স্থান থেকেই অপতৎপরতা চালানোর সক্ষমতা রাখে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, অন্তত ১২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশ থেকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে মেহেদী হাসান কলিন্স ও গোলাম রসুল যুক্তরাষ্ট্রে, তাজ মালয়েশিয়ায়, ইব্রাহিম ইউরোপে এবং কিলার আব্বাস ও জিসান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন। ভারতে আছে আগা শামীম, জব্বার ও ভিপি হান্নানসহ আরও অনেকে।

দেশে আত্মগোপনে থাকা সক্রিয় সন্ত্রাসী
৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথবাহিনী। এদের মধ্যে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ অন্যতম। জামিনে বের হওয়া পিচ্চি হেলালের অবস্থান নিশ্চিত না হলেও তাঁর গ্রুপ মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। বর্তমানে ডজনখানেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যমতে, রাজধানীতে বর্তমানে চার শতাধিক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছে, যারা আগ্নেয়াস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ এবং ভাড়াটে হিসেবে কাজ করে।

উত্তপ্ত মিরপুর ও মোহাম্মদপুর
মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকার চাঁদাবাজি ও আধিপত্য সবসময়ই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমানে বিদেশে থাকা শাহাদাত হোসেন, মফিজুর রহমান মামুন ও মোক্তার হোসেনের বাহিনী এসব এলাকায় সক্রিয়। পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান, প্রায় দুই যুগ পর জামিনে বের হওয়া পিচ্চি হেলাল বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। তাঁর অধীনে অনেকগুলো সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে।

মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকায় সক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকার নিয়ন্ত্রক শিহাব হোসেন শয়ন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে তাঁর প্রভাব বজায় রেখেছেন। এসব সন্ত্রাসীর প্রত্যেকের নামে ডজন থেকে তিন ডজন পর্যন্ত মামলা রয়েছে। পিচ্চি হেলালের বিরুদ্ধে ১২টি এবং মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে দুই ডজনের বেশি মামলা আছে। বিদেশে বা কারাগারে থেকেও তারা কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদার জন্য চাপ দিচ্ছে।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা  হত্যাকাণ্ড
নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর দেশে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে, যার অধিকাংশে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জড়িত। গত ১০ নভেম্বর তারিক সাইফ মামুন, ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদি এবং ৭ জানুয়ারি মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু করেছে এবং এখন পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। ডিএমপি ঢাকার ৬২৫টি কেন্দ্রকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে সব ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ইউনিটভিত্তিক তালিকা করা হয়েছে। নির্বাচন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের গতিবিধি কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। দেশের বাইরে থাকা সন্ত্রাসীদের বিষয়েও আমাদের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে।”